Assalam Academy
0 মন্তব্য
17 Aug, 2025
মাওলানা মুহাম্মাদ ইলিয়াছ খান
কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণে জীবন পরিচালনা করাই মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় সাধনা। আর এই পথচলা যেন সহজ হয় সেজন্য জীবনব্যাপী সাধনা করেছেন অসংখ্য মনীষী। সেই লক্ষ্যে পথচলা একটি কাফেলার নাম হল ‘আলআইম্মাতুল হানাফিয়্যাহ’। তাদের জীবনব্যাপী চেষ্টা-সাধনায় গড়ে উঠেছে ‘আলফিকহুল হানাফী’।
এই কাফেলার পুরোধা হিসেবে আছেন ইমাম আবু হানীফা রহ.। তিনি ২য় শতকের বিখ্যাত ফকীহ। ফিকহে ইসলামীর নতুন ধারায় সংকলনের অঙ্গনের রূপকার। তিনি এবং তার অনুসারীদের চেষ্টা-সাধনায় গড়ে উঠেছে ফিকহে ইসলামীর নতুন ধারা। এটি প্রসিদ্ধ হয়েছে ‘আলফিকহুল হানাফী’ বা ‘আলমাযহাবুল হানাফী’ নামে।
কুরআন-সুন্নাহ থেকে হালাল-হারামের বিধান, ইবাদতের সঠিক নিয়ম-কানুন, হুকুক ও অধিকার ইত্যাদি সঠিকভাবে জানা প্রত্যেক মুসলিমেরই প্রয়োজন। আর এক্ষেত্রে ফিকহ-শাস্ত্রের মুজতাহিদ ইমামগণের অনুসরণের কোন বিকল্প নেই। বিষয়টি স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করার জন্য একটি মৌলিক বিষয় বুঝে নেওয়া দরকার। কুরআন-সুন্নাহর সকল নির্দেশনা মৌলিক দুই ভাগে বিভক্ত :
১. যা অনুধাবনে ইজতিহাদী পর্যায়ের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অপরিহার্য।
২. যা অনুধাবনে ইজতিহাদী পর্যায়ের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অপরিহার্য নয়।
প্রথম শ্রেণীর নির্দেশনাগুলো মূলত ‘আহকাম’ বিষয়ক। ‘আহকাম’ অর্থ হালাল-হারাম, জায়েয-নাজায়েয এবং কর্তব্য ও কর্মপদ্ধতি বিষয়ক বিধান। দ্বিতীয় শ্রেণীর নির্দেশনাগুলো মূলত বিশ্বাস ও চেতনা এবং চরিত্র ও নৈতিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এগুলো মানুষকে আখিরাতের চেতনায় উজ্জীবিত করে। ঈমান ও ইয়াকীনে সমৃদ্ধ করে।
কুরআন-সুন্নাহর আহকাম শ্রেণীর নির্দেশনাগুলোই মূলত ইজতিহাদ ও তাকলীদের ক্ষেত্র। এগুলো ছাড়া অন্যান্য বিষয়ের ফলপ্রসূ অধ্যয়নের জন্য মৌলিকভাবে ইজতিহাদের প্রয়োজন নেই। তবে এজন্য প্রয়োজন সঠিক দ্বীনী রুচি অর্জন। পাশাপাশি এর সঠিক ব্যবহার করতে পারার যোগ্যতা। আর এটি অর্জিত হয় হক্কানী উলামা-মাশায়েখের সোহবতের দ্বারা। তাই সাধারণ পাঠকও কুরআন-সুন্নাহ্র এই অংশ সরাসরি অধ্যয়ন করতে পারেন। তা থেকে দ্বীনী চেতনা আহরণ করতে পারেন।
পক্ষান্তরে আহকাম বিষয়ক অধিকাংশ নির্দেশনা যে কেউ সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে বুঝতে পারে না। এজন্য ইজতিহাদী পর্যায়ের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অপরিহার্য। তাই সেসব বিধান অনুসরণের শরীয়তসম্মত পন্থা হচ্ছে :
১. যিনি ইজতিহাদের যোগ্যতার অধিকারী তিনি ইজতিহাদের ভিত্তিতে আমল করবেন।
২. যার ইজতিহাদের যোগ্যতা নেই তিনি মুজতাহিদের তাকলীদ করবেন।
এটিই হচ্ছে কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণের কুরআন-সুন্নাহসম্মত পন্থা।
আর এই ইজতেহাদের ভিত্তিতে কুরআন সুন্নাহর যে সংকলন তৈরী হয়েছে সেটাই মাযহাব। মাযহাব ভিন্ন কিছু নয়। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বের হয়ে আসা মাসায়েলেরই সংকলিত রূপ। মাযহাবের ইমামগণ কুরআন-সুন্নাহর সিদ্ধান্তের আলোকে পুরো জীবনের করণীয়-বর্জনীয়সমূহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ফলে যে কোনো মানুষের জন্য সহজে কুরআন-সুন্নাহর বিধান জানা ও মানা সহজে সম্ভব হয়।
খাইরুল কুরুনে এই ধরনের অনেকগুলো মাযহাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এগুলোর মাঝে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো হানাফী মাযহাব বা ফিকহে হানাফী। আজকে আমরা খুব সংক্ষেপে হানাফী মাযহাবের কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করব।
ফিকহে হানাফীর প্রথম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তা কুরআন-সুন্নাহ অনুসরণের স্বীকৃত ও সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি। মুজতাহিদ ইমামগণের ইজতিহাদী যোগ্যতা এবং তাঁদের সংকলিত ফিকহের নির্ভরযোগ্যতার বিষয়ে গোটা মুসলিম উম্মাহ একমত। এ প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনুল উযীর (মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম) ইয়ামানী (মৃত্যু: ৮৪০ হি.) বলেন, ‘তাঁর (ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর) মুজতাহিদ হওয়ার বিষয়ে (মুসলিম উম্মাহর) ইজমা রয়েছে। কেননা ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর মতামতসমূহ তাবেয়ী যুগ থেকে আজ নবম হিজরী শতক পর্যন্ত গোটা মুসলিম জাহানে সর্বজনবিদিত। যারা তা বর্ণনা করেন এবং যারা অনুসরণ করেন কারো উপরই আপত্তি করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে মুসলিম উম্মাহর (আলিমগণের) অবস্থান হল, তাঁরা হয়তো সরাসরি তার অনুসরণ করেছেন, কিংবা অনুসরণকারীদের উপর আপত্তি করা থেকে বিরত থেকেছেন। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে এভাবেই ইজমা সম্পন্ন হয়ে থাকে।’ (আর রওযুল বাছিম, মাকানাতুল ইমাম আবী হানীফা ফিল হাদীস পৃ. ১৬৪-১৬৫)
এ বিষয়টি শুধু ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর ক্ষেত্রেই নয়, তাঁর মনীষী সঙ্গীদের ক্ষেত্রে এবং অন্য তিন ইমামের ক্ষেত্রেও সমান সত্য।
ফিকহে হানাফীর অন্যতম মূলনীতি হল, যে বিষয়ে কুরআনে কারীমে স্পষ্টভাবে কোন সিদ্ধান্ত বর্ণনা করা হয়েছে সে বিষয়ে সেটিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে এর বিপরীত কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কেননা কুরআনে কারীমের যে কোন বিধান সবকিছুর ঊর্ধ্বে বলে গণ্য হবে। সুতরাং যে বিষয়ে কুরআনে কারীমে কোন সিদ্ধান্ত বর্ণনা করা হয়েছে সে বিষয়ে সেটিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
এ বিষয়ে ইমাম আবু হানীফা রহ. থেকে অনেক সহীহ সনদে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘আমি যখন কোন মাসআলার সমাধান কিতাবুল্লাহ্য় পাই তখন সেখান থেকেই সমাধান গ্রহণ করি।’ -আলইনতিকা ফী ফাযাইলিল আইম্মাতিছ ছালাছাতিল ফুকাহা, ইবনে আবদিল বার পৃ. ২৬১
তো এ নীতি থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, ফিকহে হানাফীতে যে কোন মাসআলার ক্ষেত্রে কুরআনে কারীমে বর্ণিত সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
ফিকহে হানাফীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, এতে কুরআনে কারীমের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত সহীহ হাদীসই সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য ও অগ্রাধিকারযোগ্য। ইমাম আবু হানীফা রহ. থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘আমি যখন কোন মাসআলার সমাধান কিতাবুল্লাহ্য় না পাই তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ এবং সহীহ হাদীস থেকে গ্রহণ করি, যা নির্ভরযোগ্য রাবীদের মাধ্যমে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। সহীহ হাদীস আমাদের জন্য শিরোধার্য। একে পরিত্যাগ করে অন্য কিছুর শরণাপন্ন হওয়ার প্রশ্নই আসে না।’ -আলইনতিকা ফী ফাযাইলিল আইম্মাতিছ ছালাছাতিল ফুকাহা, ইবনে আবদিল বার পৃ. ২৬১
সুতরাং স্পষ্ট আমলযোগ্য সহীহ হাদীস থাকা অবস্থায় এর পরিবর্তে অন্য কোন কিছুর দিকে প্রত্যাবর্তন করার কোন সুযোগ নেই। অবশ্য যদি হাদীস সহীহ না হয় কিংবা উদ্দিষ্ট বিষয়ের ক্ষেত্রে স্পষ্ট না হয় তাহলে সে হাদীস দ্বারা উক্ত বিষয়ের ক্ষেত্রে দলীল পেশ করার সুযোগ নেই।

ফিকহে হানাফীর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, এতে কুরআন-সুন্নাহর পর সাহাবায়ে কেরামের সিদ্ধান্তই সর্বাগ্রে থাকবে। এর ক্ষেত্র তুলে ধরা হচ্ছে। কিছু কিছু বিষয় এমন আছে যেগুলোতে কুরআন-হাদীসে স্পষ্টভাবে কিছু বর্ণিত নেই। কিন্তু সেক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম কোন একটি বিষয়ের উপর একমত হয়ে গেছেন। এ জাতীয় ক্ষেত্রে সেটিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। আর যদি তাদের মাঝে ইখতেলাফ হয়ে থাকে তাহলে তাদের মতসমূহের মধ্য থেকেই কোন একটিকে গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন কোন মত সৃষ্টি করা হয়নি।
এ বিষয়টিও ইমাম আবু হানীফা রহ. থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, ‘আমি যখন কোন মাসআলার সমাধান কুরআন-সুন্নাহতে না পাই তখন সাহাবায়ে কেরামের সিদ্ধান্তের শরণাপন্ন হই। কিতাবুল্লাহ, সুন্নাতু রাসূলিল্লাহ ও ইজমায়ে সাহাবার সামনে কিয়াস চলতে পারে না। তবে যে বিষয়ে সাহাবীগণের একাধিক মত রয়েছে সেখানে ইজতিহাদের মাধ্যমে যার মত কিতাব-সুন্নাহ্র অধিক নিকটবর্তী বলে মনে হয় তা-ই গ্রহণ করি।’ -আলইনতিকা ফী ফাযাইলিল আইম্মাতিছ ছালাছাতিল ফুকাহা, ইবনে আবদিল বার পৃ. ২৬১
ফিকহে হানাফীর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, এতে কুরআন-সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের অনুসরণের পর তাবেঈগণের ইজতিহাদী মতের প্রতিও সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হয়। তাই তারা যে বিষয়ে ইজমা বা ঐক্যমত প্রদান করেছেন সে বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্তের বিপরীত কিছু করা হয় না।
ইমাম আবূ হানীফা নিজেও তাবেঈ ছিলেন। তবুও তিনি তাবেঈগণের মতের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। ইলমের প্রতি তার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নজির এটি। আর তাই এটি ফিকহে হানাফীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি।
এ বিষয়ে ইমাম আবু হানীফা রহ. বলেন, ‘আমি যখন কোন মাসআলার সমাধানের ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের মতের ক্ষেত্রে সমাধান না পাই তখন ইজতিহাদের মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছে থাকি। তবে এক্ষেত্রেও তাবেয়ীগণের সর্বসম্মত কোন ইজতিহাদ ও সিদ্ধান্ত থাকলে তা থেকে বিচ্ছিন্ন হই না। -আলইনতিকা ফী ফাযাইলিল আইম্মাতিছ ছালাছাতিল ফুকাহা, ইবনে আবদিল বার পৃ. ২৬১, ২৬২, ২৬৭
উপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, ফিকহে হানাফীতে তাবেঈগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত গুরুত্ব ও সম্মানের সাথে আমলযোগ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
ফিকহে হানাফীর অসংখ্য মাসআলার মূল ভিত্তি হল সাহাবী-তাবেঈগণের ফতোয়া। যুগে যুগে যখন নতুন নতুন মাসআলা সামনে এসেছে তখন প্রয়োজন হয়েছে ইজতেহাদের। সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকেই একদল সাহাবী এই মহান গুরুত্বপূর্ণ কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন। তাবেঈ ও তাবয়ে তাবেঈদের যুগেও এই ধারা ব্যাপকভাবে অব্যাহত ছিল। শুধু তাই নয়, আজ পর্যন্তও উম্মাহর একদল ফকীহ এই গুরুভার দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে চলেছেন।
ইমাম আবূ হানীফা রহ. নিজেও মুজতাহিদ ছিলেন। কিন্তু অসংখ্য মাসআলায় তিনি পূর্বের কোন সাহাবী বা তাবেঈর ফতোয়াকে গ্রহণ করেছেন। নিজে কোন মত ব্যক্ত করেননি। ফিকহে হানাফীর ক্ষেত্রে এ ধরণের মাসায়েলের অভাব নেই। আর এর ফলে ফিকহে হানাফী অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। এটি সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেঈনের ফিকহের অনেক বড় অংশ নিজের মাঝে ধারণ করে রেখেছে।
তাই আমরা বলতে পারি, ফিকহে হানাফী কেবল ইমাম আবূ হানীফা ও তার অনুসারীগণের ইজতেহাদ নয়। বরং এটি ফিকহুস সাহাবা ও ফিকহুত তাবেঈনের উত্তম সংকলন।

ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর একটি বিশেষত্ব এই যে, তিনি ছিলেন সঙ্গী-সৌভাগ্যে অতি সৌভাগ্যবান। সমকালীন শ্রেষ্ঠ মনীষার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তাঁর সঙ্গে ছিল। কুরআন-সুন্নাহ, হাদীস, আছার, ফিকহ, ইজতিহাদ, যুহদ ও আরাবিয়্যাতের দিকপাল মনীষীরা ছিলেন তাঁর শিষ্য। এঁদের সম্মিলিত আলোচনা ও পর্যালোচনার দ্বারা ফিকহে হানাফী সংকলিত হয়েছে।
সমকালীন হাদীস ও ফিকহের বিখ্যাত ইমামগণও ফিকহে হানাফীর এই বৈশিষ্ট্য সর্ম্পকে সচেতন ছিলেন। কুফা নগরীর বিখ্যাত মনীষী ইমাম সুলায়মান ইবনে মিহরান আমাশ রাহ. (১৪৮ হি.) কে এক ব্যক্তি মাসআলা জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি তখন (ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর মজলিসের দিকে ইঙ্গিত করে) বললেন, এঁদের জিজ্ঞাসা করুন। কেননা, এঁদের নিকট যখন কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত হয় তখন তারা সম্মিলিতভাবে মতবিনিময় করেন এবং (সর্বদিক পর্যালোচনার পর) সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হন।’-জামিউল মাসানীদ, আবুল মুআইয়াদ খুয়ারাযমী ১/২৭-২৮
ইবনে কারামাহ বলেন, ‘আমরা একদিন ওকী ইবনুল জাররাহ রাহ. এর মজলিসে ছিলাম। জনৈক ব্যক্তি কোনো বিষয়ে বললেন, ‘আবু হানীফা এখানে ভুল করেছেন।’ ওকী বললেন, আবু হানীফা কীভাবে ভুল করতে পারেন, তাঁর সঙ্গে রয়েছেন আবু ইউসুফ, যুফার ইবনুল হুযাইল ও মুহাম্মাদ ইবনুল হাসানের মতো ফকীহ ও মুজতাহিদ, হিব্বান ও মানদালের মতো হাফিযুল হাদীস, কাসিম ইবনে মা’ন-এর মতো আরাবি ভাষার ইমাম এবং দাউদ ইবনে নুছাইর ত্বয়ী ও ফুযাইল ইবনে ইয়াযের মতো আবিদ ও যাহিদ? এই পর্যায়ের সঙ্গী যাঁর রয়েছে তিনি ভুল করবেন কীভাবে? কখনো যদি তাঁর ভুল হয় তবে তো এঁরাই তাকে ফিরিয়ে আনবেন।’ -জামিউল মাসানীদ, আবুল মুআইয়াদ খুয়ারাযমী ১/৩৩
ইমাম আসাদ ইবনুল ফুরাত রাহ. (২১৩ হি.) বলেন, ‘ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর চল্লিশজন সঙ্গী গ্রন্থসমূহ (ফিকহে হানাফী) সংকলন করেছেন। তাঁদের শীর্ষ দশজনের মধ্যে ছিলেন আবু ইউসুফ, যুফার, দাউদ ত্বয়ী, আসাদ ইবনে আমর, ইউসুফ ইবনে খালিদ ও ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া ইবনে আবী যাইদা। শেষোক্ত জন সিদ্ধান্তসমূহ লিপিবদ্ধ করতেন। দীর্ঘ ত্রিশ বছর তিনি এই দায়িত্ব পালন করেছেন।’ -ইবনু আবিল ‘আওয়াম-এর সূত্রে যাহিদ হাসান কাওছারী – ভূমিকা, নাসবুর রায়াহ ১/৩৮
উপরের বর্ণনাসমূহ থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, ফিকহে হানাফী কেবল এক ব্যক্তির সংকলন নয়। বরং ফুকাহায়ে কেরামের একটি জামাতের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত। তাই এর ভিত্তি অনেক মজবুত ও শক্তিশালী। তেমনি এটি গ্রহণযোগ্যতার বিচারেও অগ্রগণ্য।
ইতিহাসের বাস্তবতা এই যে, চার ইমামের সময় কালে মুসলিম জাহানে অনেক মুজতাহিদ বিদ্যমান ছিলেন। নিজ নিজ অঞ্চলে তাঁদের তাকলীদও হয়েছে। কিন্তু চার ইমামের বৈশিষ্ট্য এই যে, তাদের সঙ্গীগণ তাঁদের মতামতকে সংরক্ষণ করেছেন।
ফিকহে হানাফীর ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছে। ইমাম আবু হানীফার শাগরেদ ও অনুসারীগণ হানাফী মাযহাবকে আলোচনা ও পর্যালোচনা দ্বারা সুসংহত করেছেন। এগুলোকে ভিত্তি করে ফিকহের আরো বিস্তৃত পরিসর তৈরী করেছেন। মূলনীতিসমূহকে সামনে রেখে অসংখ্য মাসায়েল বের করেছেন। সেগুলোর শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত করেছেন।
এভাবে হানাফী মাযহাব ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হয়েছে। তৈরী হয়েছে হাজার হাজার মাসায়েলের বিস্তৃত ভাণ্ডার। বরং লাখ লাখ মাসায়েলের বিপুল ভাণ্ডার। ফিকহে হানাফীর এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। হানাফী মাযহাবের দীর্ঘায়ু ও বিপুল বিস্তারের এটি অন্যতম প্রধান কারণ।
ফিকহে হানাফী ছিল তৎকালীন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজশক্তিগুলোর রাষ্ট্রীয় আইন। বিভিন্ন সালতানাতের সময় কুফা ও বাগদাদ থেকে শুরু করে পূর্ব দিকে কাশগর ও ফারগানা পর্যন্ত, উত্তরে হালাব ও এশিয়া মাইনর পর্যন্ত এবং পশ্চিমে মিসর ও কাইরাওয়ান পর্যন্ত ফিকহে হানাফী অনুসারে কাযা পরিচালিত হয়েছে। তাই মুসলিম জাহানের এই সুবিস্তৃত অঞ্চলে কুরআন-সুন্নাহর আইন বাস্তবায়ন এবং সুবিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ফিকহে হানাফীর অবদান অনস্বীকার্য।
হিজরী দ্বিতীয় শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কুরআন-সুন্নাহর জগদ্বিখ্যাত মনীষীদের প্রত্যক্ষ প্রচেষ্টায় যখন ফিকহে হানাফী সংকলিত হল তখন থেকেই মুসলিম জাহানের বিস্তৃত ভূখণ্ডে তা বিপুলভাবে সমাদৃত হয়। হাদীস ও ফিকহের ইমামগণের মাধ্যমে বিখ্যাত শহরগুলোতে ফিকহে হানাফীর বহু কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
ফলে কুফা নগরীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা., হযরত আলী ইবনে আবী তালিব রা. এবং অন্যান্য ফকীহ সাহাবীদের মাধ্যমে ফিকহে ইসলামীর যে বুনিয়াদ স্থাপিত হয়েছিল তা ইরাকের সীমানা অতিক্রম করে গোটা মুসলিম জাহানে ছড়িয়ে পড়ে। তখন প্রবল প্রতাপান্বিত আব্বাসী শাসনের পূর্ণ যৌবন। এ সময় ফিকহে হানাফীই রাষ্ট্রীয় আইন হিসেবে গৃহীত হল।
হিজরী দ্বিতীয় শতকের শেষার্ধে ইমাম আবু হানীফা রা.-এর বিখ্যাত সঙ্গীগণ কাযা ও বিচারের মসনদ অলংকৃত করেন। ইমাম আবু ইউসুফ রাহ. (১৮৩ হি.) ছিলেন গোটা মুসলিম জাহানের কাযিউল কুযাত। হারুনুর রশীদের সময় দারুল খিলাফা রাক্কা শহরে স্থানান্তরিত হলে ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান রাহ. (১৩১-১৮৯ হি.) সে শহরে কাযার দায়িত্ব পালন করেন। তদ্রূপ ইমাম যুফার ইবনুল হুযাইল (১৫৮ হি.) বছরায়, ইমাম কাসিম ইবনে মা’ন (১৭৫ হি.) কুফায়, ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া ইবনে আবী যাইদাহ (১৮৪ হি.) মাদায়েনে, ইমাম আবু মুহাম্মাদ নূহ ইবনে দাররাজ (১৮২ হি.) কুফায়, ইমাম হাফস ইবনে গিয়াছ (১১৭-১৯৪ হি.) কুফা ও বাগদাদে (কুফায় তেরো বছর, বাগদাদে দুই বছর) আফিয়া ইবনে ইয়াযীদ আওদী (১৮০), বাগদাদে কাযা পরিচালনা করেন।
তদ্রূপ হুসাইন ইবনুল হাসান আওফী (২০১) পূর্ব বাগদাদে, আলী ইবনে যাবইয়ান আবসী (১৯২ হি.), ইউসুফ ইবনে ইমাম আবু ইউসুফ (১৯২ হি.) বাগদাদে, মুহাম্মাদ ইবনে মুকাতিল রাযী (২২৬ হি.) ও নাসর ইবনে বুজাইর যুহলী রায় শহরে কাযার দায়িত্বে ছিলেন। ইমাম ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ ইবনে আবু হানীফা (২১২ হি.) ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সামাআ (১৩০ হি.-২৩৩ হি.) ইমাম ঈসা ইবনে আবান ইবনে সাদাকা (২২১ হি.), আবদুর রহমান ইবনে ইসহাক (২২৮ হি.), বিশর ইবনুল ওয়ালীদ কিনদী (২৩৮ হি.), হাইয়ান ইবনে বিশর (২৩৮ হি.), হাসান ইবনে উছমান যিয়াদী (২৪৩ হি.), উমার ইবনে হাবীব (২৬০ হি.) ইবরাহীম ইবনে ইসহাক (২৭৭ হি.), বুহলূল ইবনে ইসহাক (২৯৮ হি.), আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ আলবিরতী (২৮০ হি.) কাযী আবু খাযিম আবদুল হামীদ ইবনে আবদুল আযীয (২৯২ হি.), কাযী আহমদ ইবনে ইসহাক ইবনে বুহলূল (২৩১-৩১০ হি.), আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ নিশাপুরী (৩৫১ হি.), আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ, আবু বকর দামাগানী, তহাবী ও কারখীর শীষ্য, হুসাইন ইবনে আলী সাইমারী (৩৫১-৪৩৬ হি.) প্রমুখ ফিকহ ও হাদীসের বিখ্যাত ইমাম ও তাঁদের শীষ্যদের উপর কাযার দায়িত্ব অর্পিত ছিল।
বাগদাদ, কুফা, বছরা, আম্বার, হীত, মাওসিল, ওয়াসিত, মাম্বিজ, রায় প্রভৃতি বিখ্যাত শহরে তাঁরা ফিকহে হানাফী অনুসারে কাযা পরিচালনা করেছেন। মুসলিম জাহানের এই কেন্দ্রীয় শহরগুলিতে এত অধিক সংখ্যক ফকীহ ও কাযী বিদ্যমান ছিলেন, যা অনুমান করাও কঠিন।
আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যা গ্রন্থে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে কিভাবে ফিকহে হানাফী অনুসারে ফায়সালা ও কাযা পরিচালনা করা হত সে বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে। সে আলোচনা থেকে এটা একেবারেই স্পষ্ট বিষয় যে, পৃথিবীর মুসলিম দেশগুলোতে ব্যাপকভাবেই কাযা ও বিচারের ক্ষেত্রে ফিকহে হানাফী অনুসরণ করা হত। প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য পর্যন্ত মুসলিম জাহানের বিখ্যাত শহরগুলোতে ফিকহে হানাফীর দ্বারা কুরআন-সুন্নাহর আইন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর তখন মুসলিম সাম্রাজ্য ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য এবং মুসলিম উম্মাহ ছিল পৃথিবীর সেরা শক্তি।
সেই ধারা বন্ধ হয়নি। মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক উত্থান ও প্রতিষ্ঠার দ্বিতীয় পর্বেও এই ধারা চালু ছিল। এই সেদিন পর্যন্তও তো সালতানাতে উছমানিয়া প্রতিষ্ঠিত ছিল। সেখানের বিচার পরিচালনার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা’। ফিকহে হানাফী অনুযায়ী রচিত হয়েছে কিতাবটি। আর এর আলোকেই পরিচালিত হত রাষ্ট্রের মুআমালা সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি। আমাদের এই উপমহাদেশেও বৃটিশের অনুপ্রবেশের আগ পর্যন্ত ফিকহে হানাফী অনুসারে কাযা ও বিচার পরিচালিত হয়েছে। ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী এর উজ্জ্বল প্রমাণ।
হানাফী মাযহাবের আরো একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করছি। ফিকহে হানাফীতে সব বিষয়ে সতর্কতার দিককে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কোন বিষয়ের দুটি দিক থাকলে সেক্ষেত্রে সতর্কতার দিক যেটি সে অনুসারে ফতোয়া প্রদান করা হয়েছে। ফিকহে হানাফীর বিভিন্ন মাসাইলের ক্ষেত্রে এর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন উসুলের ক্ষেত্রেও এই নীতির প্রয়োগ দেখা যায়।
এবার আমরা এই উসূলের যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা করছি। শরীয়তের প্রতিটি বিধানের ক্ষেত্রে মূল বিষয় থাকে আল্লাহর বিধান যথাযথভাবে আদায় করা। এটা শরীয়তে ইসলামীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাকসাদ। তো কখনো কোন কোন বিধানের ক্ষেত্রে দ্বিধা তৈরী হয় যে, এর বিধান কী হবে? তখন ফুকাহায়ে কেরাম সতর্কতার নীতি প্রয়োগ করেন। অর্থাৎ যে দিক অনুসরণ করলে তুলনামূলক বিধানটির মাকসাদ পূর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে অধিক সহায়ক হবে সে দিকটিই অবলম্বন করা হবে।
ফিকহে হানাফীতে ব্যাপকভাবে এই নীতি প্রয়োগ করা হয়েছে। এর একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি। ইমাম জাসসাস রহ. তার বিখ্যাত গ্রন্থ আহকামুল কুরআনে খণ্ড ৩ পৃ. ৪৯৭ তে সূরা ফুরকানের ৪৮ নং আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ করেছেন,
الإباحة والحظر متى اجتمعا فالحكم للحظر
কোন বিষয়ে যখন বৈধতা ও নিষিদ্ধতার দ্বিমুখী দিক একত্র হয় তখন কাজটি নিষিদ্ধ বলে ফতোয়া প্রদান করা হবে।
এটি ফিকহে হানাফীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মূলনীতি। এ মূলনীতির আলোকে অসংখ্য মাসআলায় সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়েছে। এ নীতিটিতে আমরা সতর্কতার উসূলের প্রয়োগ দেখলাম। কোন একটি বিষয়ে জায়েয হওয়ার দিকও পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি নাজায়েয হওয়ার দিকও পাওয়া যাচ্ছে। উভয় দিকই পাশাপাশি বিদ্যমান।
এ অবস্থায় সতর্কতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত প্রদান করা হবে। কাজটিকে জায়েয না বলে নাজায়েয বলা হবে। কেননা নাজায়েয হলে মানুষ কাজটি থেকে বিরত থাকবে। এতে কোন ক্ষতি নেই। বিপরীতে যদি বৈধতার ফতোয়া দেওয়া হয় তাহলে সমস্যা তৈরী হতে পারে। কাজটি যদি মূলত নাজায়েয হয়ে থাকে তাহলে তা মানুষের জন্য ক্ষতিকর সাব্যস্ত হবে। এমনটি যেন না হয় সেজন্য সতর্কতার নীতি অনুযায়ী আমল করা হয়েছে। এটি ফিকহে হানাফীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য।
ফিকহে হানাফীর অসংখ্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সেসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে সম্ভব নয়। আমরা এখানে খুব সংক্ষেপে দশটি বৈশিষ্ট্যের কথা আলোচনা করলাম। এগুলোর আলোকে আমরা ফিকহে হানাফীর বড় বড় কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরলাম। আশা করি, পাঠকবৃন্দ এ প্রবন্ধের মাধ্যমে ফিকহে হানাফীর অনন্য বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বেশ কিছু ধারণা লাভ করতে পারবে। আর এতেই আমাদের এই প্রবন্ধের সফলতা।
লেখক:
বিভাগীয় প্রধান, ইফতা বিভাগ, জামিয়া আরাবিয়া আনওয়ারুল উলূম হাজী সাইজউদ্দীন, শিবু মার্কেট, না.গঞ্জ
Assalam Academy
0 মন্তব্য